Marxists Internet Archive
Bangla Section


জার্মান ভাবাদর্শ

কার্ল মার্কস


সূচীপত্র

ভাবাদর্শের বাস্তব ভিত্তি
খ. সম্পত্তির প্রতি রাষ্ট্র ও আইনের সম্পর্ক

প্রাচীন জগতে, মধ্যযুুগের মতই, সম্পত্তির প্রথম আঙ্গিক ছিল গোত্র সম্পত্তি। এটি নির্ধারিত হত রোমানদের ক্ষেত্রে প্রধানত যুদ্ধের মাধ্যমে, জার্মানদের ক্ষেত্রে পশুচারণ দিয়ে। প্রাচীন মানুষদের ক্ষেত্রে, যেহেতু বিভিন্ন গোত্র একই শহরে বাস করতো, গোত্র সম্পত্তি মানে হত রাষ্ট্র সম্পত্তি। আর এতে স্বতন্ত্রের অধিকার ছিল নিছক দখল হিসেবে যা পুরো গোত্র সম্পত্তির মতই শুধুই ভূমি সম্পত্তিতেই আবদ্ধ ছিল। আধুনিক জাতিগুলোর মত প্রাচীনদের ক্ষেত্রেও আসল ব্যক্তি মালিকানা আরম্ভ হয় ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পত্তি দিয়ে (দাসত্ব আর জনসম্প্রদায় আইন অনুসারে পূর্ণ মালিকানা)। মধ্যযুগ ছাপিয়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত জাতিগুলোর ক্ষেত্রে ব্যক্তি সম্পত্তি বেরিয়ে এসেছে বিভিন্ন দশার মধ্য হতে- সামন্ত ভূ-সম্পত্তি, আইনী সংঘগত অস্থাবর সম্পত্তি, ম্যানুফেকচার-পুঁজি-আধুনিক পুঁজিতে এই পুঁজি নির্ধারিত বড় শিল্প আর সার্বজনীন প্রতিযোগিতা দিয়ে, যেমন নিখাদ ব্যক্তি সম্পত্তি যা জনসম্প্রদায় প্রতিষ্ঠানের সমস্ত সদৃশ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে এবং সম্পত্তি বিকাশে রাষ্ট্রের যে কোন ধরণের প্রভাবের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এই আধুনিক ব্যক্তি সম্পত্তি সম্পর্কিত আধুনিক রাষ্ট্রের সাথে, যা সম্পত্তির মালিকদের দ্বারা করের মাধ্যমে ক্রমাগত খরিদ করে। এই রাষ্ট্র সম্পত্তির মালিকদের একবারে হাতের পুতুল হয়ে গেছে জাতীয় ঋণের মাধ্যমে, আর এর অস্তিত্ব পুরোপুরি নির্ভর হয়ে পড়েছে বাণিজ্যিক দায়ের উপর যা সম্পত্তির মালিক, বুর্জোয়ারা স্টক একচেঞ্জে রাষ্ট্রীয় তহবিল উঠানামায় বাড়ায় কমায়। এটা একটা শ্রেণী আর জমিদারী নয়, নিছক এই ঘটনার দ্বারা বুর্জোয়ারা আর আঞ্চলিক নয়, জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের সংগঠিত করতে আর এর গড় স্বার্থে সাধারণ আঙ্গিক দিতে বাধ্য হয়। সম্প্রদায় হতে ব্যক্তিসম্পত্তির মুক্তির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র একটি আলাদা সত্তা হয়ে গেছে, সিভিল সমাজের পাশে আর বাইরে। কিন্তু এটা বুর্জোয়াদের ভেতরের আর বাইরের উভয় উদ্দেশ্যের প্রয়োজনে গ্রহণ করা, তাদের সম্পত্তি আর স্বার্থের দ্বি-পাক্ষিক নিশ্চয়তার জন্য নেয়া সাংগঠনিক আঙ্গিকের বেশি কিছু নয়। আজকাল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা দেখতে পাওয়া যাবে কেবল সেসব দেশেই যেখানে বড় ভূ সম্পত্তিওয়ালারা এখনো সম্পূর্ণ শ্রেণীতে পরিণত হয়নি, যেখানে বড় ভূ সম্পত্তি (যা আরো অগ্রসর দেশে লোপাট হয়ে গেছে) এখনো পালন করার মতো ভূমিকা পায়; আর যেখানে জনতার কোন অংশই অপরের ওপর আধিপত্য অর্জন করতে পারেনি এমন মিশ্র ক্ষমতার দেশে। বিশেষ করে জার্মানীতে এটা বাস্তব। আধুনিক রাষ্ট্রের সবচাইতে নিখুঁত উদাহরণ উত্তর আমেরিকা। আধুনিক ফরাসি, ইংরেজ আর আমেরিকান সব লেখকেরা যে মত প্রকাশ করেন তা হল- রাষ্ট্র কেবল ব্যক্তি সম্পত্তির খাতিরেই বহাল, ফলে এই ঘটনাটা সহজ মানুষদের মাথায় ঢুকে গেছে।
যেহেতু রাষ্ট্রের কোন শাসক শ্রেণীর স্বতন্ত্রেরা তাদের সাধারণ স্বার্থ বিবৃত করে, যে রাষ্ট্রে কোন পুরো সিভিল সমাজ কাটছাঁট হয়ে থাকে, এটা বোঝা যায় যে- সম্প্রদায়গত সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাষ্ট্র মধ্যস্ততাকারী হিসেবে ক্রিয়া করে, আর এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক আঙ্গিক পায়। তাই এই মায়া তৈরী হয় যে আইন ইচ্ছার ভিত্তিতে প্রোথিত, আর আদতে এর বাস্তব ভিত্তি হতে তালাক পাওয়া ইচ্ছাতে- স্বাধীন ইচ্ছাতে। একই ভাবে, এর নিজের পালায় আইন তত্ত্ব বাস্তবে আইনে সংকুচিত হয়।
স্বাভাবিক জনসম্প্রদায়ের কাঠামো বিযুক্তি হতে ব্যক্তি সম্পত্তির সাথে যুগপৎভাবে সিভিল আইন বিকশিত হয়। রোমানদের সাথে ব্যক্তিসম্পত্তি আর সিভিল আইনের বিকাশ কোন পরবর্তী শিল্প ও বাণিজ্যিক ধারাবাহিকতা পায়নি; কারণ তাদের পুরো উৎপাদনের ধরণ পাল্টায় নি। আধুনিক মানুষের কাছে যেখানে সামন্ত সম্প্রদায় শিল্প ও বাণিজ্য দ্বারা সমন্বয় হারাচ্ছিল, সেখানে ব্যক্তি সম্পত্তি আর সিভিল আইনের উত্থানের মধ্যে দিয়ে এমন নতুন স্তর পেল যার পরবর্তী বিকাশ সম্ভব। যে আমালফি শহর মধ্যযুগে প্রথম বড়সড় বাণিজ্য নির্বাহ করেছিল তারাই নৌ আইন বিকশিত করেছিল।
প্রথমে ইতালি, পরে অন্যান্য দেশে যখনি শিল্প আর বাণিজ্য ব্যক্তি সম্পত্তিতে আরো বিকশিত করলো, তখনি রোমান সিভিল আইন পরিমার্জিত আঙ্গিকে আবার গ্রহণ করা হল, এই আইন কর্তৃত্বে উন্নীত হল। পরে বুর্জোয়ারা এত ক্ষমতা অর্জন করলো যে রাজরাজরারা সামন্ত অভিজাতদের উৎখাত করতে তাদের সহযোগিতা নিতে আগ্রহী হল। তখন সব দেশে (ফ্রান্সে ষোড়শ শতাব্দীতে) আইনের বাস্তব বিকাশ শুরু হল, যা ইংল্যান্ড ছাড়া সব দেশে অগ্রসর হয়েছিল রোমান পুঁথির ভিত্তিতে। ইংল্যান্ডেও রোমান আইনী নীতি অনুপ্রবেশ করাতে হল সিভিল আইনের আরো বিকাশের জন্য (বিশেষ করে ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে)। ধর্মের মতই আইনেরও সামান্যই স্বাধীন ইতিহাস আছে তা ভুলে গেলে চলবেনা।
বহাল সম্পত্তি সম্পর্ককে সিভিল আইনে সাধারণ ইচ্ছার ফল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যবহার এবং ভোগ করার অধিকার একদিকে নিজেই এই ঘটনাটি বিবৃত করে যে ব্যক্তিসম্পত্তি সম্প্রদায় হতে পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে গেছে। আর অপরদিকে এই মায়াটিও বিবৃত হয় যে ব্যক্তিসম্পত্তি নিজেই ব্যক্তিগত ইচ্ছা, জিনিসে স্বেচ্ছা ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ব্যক্তিসম্পত্তি মালিকের প্রয়োগের জন্য এই ভোগের খুবই নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সীমা আছে, যদি সে তার সম্পত্তি আর তার সাথে ভোগের অধিকারও অন্যের হাতে চলে যাওয়া দেখতে না চায়। কারণ নিছক তার ইচ্ছার সাথে বিবেচনা করা জিনিস কোন জিনিসই না, বরং মেলামেশার মাধ্যমে আর জিনিসের (একটি সম্পর্ক, যাকে দার্শনিকেরা ভাব বলেন) থেকে স্বতন্ত্র থেকেই তা বাস্তব সম্পদ হয়ে উঠে। এই আইনী মায়াটি আইনকে নিছক ইচ্ছায় নামিয়ে আনে। এটি সম্পত্তি সম্পর্ক আরো বিকশিত হলে আবশ্যকীয়ভাবেই এমন পর্যায়ে যায় যেখানে ঢাল তলোয়ার ছাড়াও কেউ নিধিরাম সর্দার হয়ে যেতে পারে। যেমন, যদি একখন্ড জমি থেকে প্রতিযোগিতার ফলে রোজগার বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তার মালিকের আইনী খেতাব আর তার সাথে ব্যবহার এবং ভোগ করার অধিকার থেকে যায়। কিন্তু এই জমি দিয়ে সে কিছুই করতে পারবে না; ভূমি মালিক হিসেবে তার কোন সম্পত্তিই নেই- যদি না জমি চাষ করার জন্য পাশাপাশি তার পুঁজি না থাকে। আইনী মারপ্যাঁচে এই মায়াটি তাদের আরো একটি ঘটনা ব্যাখ্যা করে, প্রতিটি পুঁথিতেই যা হয়। এটা একেবারেই আকস্মিক যে স্বতন্ত্রেরা তাদের মাঝে সম্পর্কে প্রবেশ করে (যেমন চুক্তি); এ থেকে ব্যাখ্যাত হয় কেন তাদের সম্পর্কগুলোতে প্রবেশ করা বা না করাঞ্চর ইচ্ছাতে বিবেচিত হয়, আর তাদের আধেয় চুক্তির পক্ষসমূহের স্বতন্ত্র স্বাধীন ইচ্ছাতেই নির্ভেজালভাবে নির্ভর করে। শিল্প আর বাণিজ্যের বিকাশের মধ্যে দিয়ে নতুন মেলামেশার আঙ্গিক (যেমন ইনস্যুরেন্স কোম্পানী) তৈরী হলেই আইন সবসময় বাধ্য হয়েছে অর্জিত সম্পত্তির ধরণের সাথে তাকেও স্বীকার করতে।
ইতিহাসে এখন পর্যন্ত প্রশ্নটা হচ্ছে দখলের । এই ধারণাটির মতো সাধারণ আর কিছু নেই। বর্বররা দখল করলো রোমান সাম্রাজ্য; আর পুরনো পৃথিবী থেকে সামন্ত ব্যবস্থায় উত্তরণ ব্যাখ্যা করতে এই দখল ঘটনাটি তৈরী হয়। বর্বরদের দখলে, যা হোক, প্রশ্নটা হচ্ছে- বিজিত জাতি শিল্প উৎপাদনী শক্তির জট খুলেছে কি না, (যেমন ঘটে আধুনিক মানুষের ক্ষেত্রে) নাকি তাদের উৎপাদনী শক্তি বেশিরভাগই নিছক তাদের সংঘে আর সম্প্রদায়ে রয়ে গেছে। দখল করা বিষয় দিয়ে দখল আরো নির্দিষ্ট হয়। কাগজে বানানো ব্যাংকারের ধন-দৌলত আদৌ দখল করা যায় না, দখল করা দেশের উৎপাদনের শর্ত এবং মেলামেশার কাছে দখলকারীর সমর্পন ছাড়া। আধুনিক শিল্প দেশের পুরো শিল্প পুঁজিটা ঐ রকম। শেষে সব জায়গাতে শীঘ্রই দখলদারী শেষ হয়। আর যখন দখল করার মত কিছু আর বাকি থাকেনা তখন উৎপাদনের পথে পা বাড়াতেই হয়। খুব শীঘ্রই নিজেকে বিবৃত করা এই উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা আরো বোঝায় যে জুড়ে বসা বিজয়ীদের গ্রহণ করা সম্প্রদায় আঙ্গিক তাদের পাওয়া বহাল উৎপাদনী শক্তির বিকাশের দশার সাথে সম্পর্কিত হতে হবে। আর যদি আরম্ভ থেকেই ঘটনাটা এমন না হয় তাহলে তাকে অবশ্যই উৎপাদনী শক্তিগুলোর মত করে পাল্টে যেতে হবে। এর মাধ্যমে এই ঘটনাও পরিষ্কার হয়ে যায়, যা মানুষের অভিবাসনের কালে সবখানে মানুষ লক্ষ্য করেছে বলে স্বীকার করে, বলতে গেলে তা হল সেবক যা ছিল প্রভু; আর বিজেতারা তাড়াতাড়ি বিজিতদের থেকে ভাষা, সংস্কৃতি আর আচার গ্রহণ করে। সামন্ত ব্যবস্থা কোন অন্যথা ছাড়াই পুরো পুরোই জার্মানী থেকে আনা ছিল। কিন্তু এর উৎস, যদ্দুর পর্যন্ত বিজেতারা সংশ্লিষ্ট, বাস্তব অভিযানের কালে সৈন্যদের সামরিক সংগঠন। এর জট খুলেছিল কেবল বিজিত দেশে পাওয়া উৎপাদনী শক্তির ক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে সঠিক সামন্ত ব্যবস্থাতে বিজয়ের পর। উৎপাদনী শক্তিগুলো দিয়ে এই আঙ্গিক কোন সীমা পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছিল তা দেখা যায় প্রাচীন রোমের স্মৃতি কথা থেকে উদ্ভূত অন্যান্য আঙ্গিকগুলো বোঝার নির্বংশ চেষ্টা হতে (শার্লেমেন ইত্যাদি)।

পরবর্তী অংশ