Marxists Internet Archive
Bangla Section


জার্মান ভাবাদর্শ

কার্ল মার্কস


সূচীপত্র

ভাবাদর্শের বাস্তব ভিত্তি
গ. উৎপাদনের স্বাভাবিক আর সভ্য সরঞ্জাম এবং সম্পত্তির আঙ্গিক সমূহ

(পান্ডুলিপিতে ছেদ)............ প্রথম থেকে সেখানে উচ্চ বিকশিত শ্রম বিভাগ আর একটি বিস্তৃত বাণিজ্যের প্রাকসিদ্ধান্ত আগের সূত্র ধরেই আসে; দ্বিতীয় থেকে চলে আঞ্চলিকতার প্রাকসিদ্ধান্ত। প্রথম ক্ষেত্রের জন্য স্বতন্ত্রদের এক জায়গায় আনতে হয়, দ্বিতীয়টিতে প্রদত্ত উৎপাদন হাতিয়ারের পাশাপাশি তারা নিজেদেরও দেখতে পায় উৎপাদনের সরঞ্জাম হিসেবে। এখানে তাই উৎপাদনের স্বাভাবিক সরঞ্জাম আর সভ্যতা দ্বারা তৈরী সরঞ্জামের পার্থক্য আসে। ক্ষেত্রকে (পানি ইত্যাদি) উৎপাদনের স্বাভাবিক সরঞ্জাম হিসেবে ধরা যায়। প্রথম ক্ষেত্রে, উৎপাদনের স্বাভাবিক সরঞ্জামঞ্চর বেলায় স্বতন্ত্রেরা প্রকৃতির বশ, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তারা বশ শ্রমের উৎপাদটার। প্রথম ক্ষেত্রে তাই সম্পত্তি (ভূ-সম্পত্তি) সরাসরি প্রাকৃতিক আধিপত্য হিসেবে আবির্ভূত হয়, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তার জায়গা নেয় শ্রম, বিশেষ করে পুঞ্জিভূত শ্রম, মানে পুঁজি। প্রথম ক্ষেত্র পূর্বানুমান করে যে স্বতন্ত্রেরা কিছু বন্ধন, পরিবার, গোত্র, খোদজমি ইত্যাদি দিয়ে একত্রিত। দ্বিতীয়টি পূর্বানুমান করে যে তারা একে অপর থেকে স্বাধীন, বিনিময় কেবল তাদের একত্রে ধরে রাখে। প্রথম ক্ষেত্রে যা অর্ন্তভূুক্ত তা হল মানুষ ও প্রকৃতির মাঝের বিনিময়, যাতে মানুষের শ্রম বিনিময়িত হয় প্রকৃতির উৎপাদের জন্য; দ্বিতীয়টিতে এটি পূর্ব আধিপত্যকভাবেই মানুষের নিজেদের মাঝে বিনিময়। প্রথম ক্ষেত্রে গড়পড়তা মানব সংবেদনই যথেষ্ট- শারীরিক এবং মানসিক ক্রিয়া তখনো আদৌ আলাদা হয়নি। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক শ্রমের মাঝের বিভাগ অবশ্যই ব্যবহারিকভাবে হয়ে যেতে হবে। প্রথম ক্ষেত্রে সম্পদহীন গোষ্ঠীর উপর সম্পদ অধিকারী গোষ্ঠীর আধিপত্যের ভিত্তি হতে পারে ব্যক্তি সম্পর্ক, এক ধরণের সম্প্রদায়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে একে অবশ্যই তৃতীয় একটি পক্ষে বস্তুগত আকার নিতে হবে, সেই পক্ষ হল টাকা। প্রথম ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র শিল্প বহাল থাকে, কিন্তু তা নির্ধারিত হয় উৎপাদনের স্বাভাবিক সরঞ্চাম প্রয়োগ দিয়ে আর তাই বিভিন্ন স্বতন্ত্রদের মাঝে শ্রম বন্টন হয় না; আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে শিল্প বহাল থাকে কেবল শ্রম বিভাগের মধ্যে এবং মাধ্যমে।
আমাদের অনুসন্ধান এখানে শুরু হয়েছে উৎপাদনের সরঞ্জাম থেকে আর বিশেষ শিল্প দশার জন্য ব্যক্তি তখনো শ্রমের সাথে যুগপৎ; ক্ষুদ্র শিল্প আর এখন পর্যন্ত সব কৃষিতে সম্পত্তি হল উৎপাদনের বহাল সরঞ্জামের আবশ্যকীয় ধারাপাত; বৃহৎ শিল্পে উৎপাদনের সরঞ্জাম আর ব্যক্তিসম্পত্তির ঠোকাঠুকি হল বৃহৎ শিল্পের উৎপন্ন আর কেবল তার সাথেই আবির্ভূত হয়। তদুপরি এই ঠোকাঠুকি উৎপাদন করতে হলে বৃহৎ শিল্পকে অবশ্যই উঁচু মাপে বিকশিত হতে হবে। আর এভাবে, কেবলমাত্র বৃহৎ শিল্পের সাথেই ব্যক্তিসম্পত্তির অপনোদন সম্ভব।
বড় শিল্প আর প্রতিযোগিতায় অস্তিত্বের শর্তের পুরো বোঝা, সীমাবদ্ধতা, স্বতন্ত্রের পক্ষপাত- এগুলো সবচাইতে সরল আঙ্গিকে একসাথে তালগোল পাকায় : ব্যক্তি সম্পত্তি ও শ্রম। টাকার সাথে সাথে সব ধরণের মেলামেশা আর খোদ মেলামেশাই স্বতন্ত্রদের জন্য আকস্মিক বলে বিবেচিত হয়। এভাবে টাকা বোঝায় যে পূর্বের সব মেলামেশা ছিল নিছক বিশেষ শর্তাধীনে স্বতন্ত্রদের মেলামেশা, স্বতন্ত্র হিসেবে স্বতন্ত্রদের মেলামেশা নয়। এই শর্তগুলোকে দুটোতে নামিয়ে আনা যায় : পুঞ্জিভূত শ্রম বা ব্যক্তি সম্পত্তি আর বাস্তব শ্রম। উভয়ই বা এদের একটা যদি রদ্‌ হয়ে যায়, তাহলে মেলামেশা থমকে যায়। আধুনিক অর্থনীতিবিদ যেমন সিসমঁদি, শেরবুলিয়েজ প্রমুখ নিজেরাই পুঁজির সংঘের প্রতি স্বতন্ত্রদের সংঘ ধারণার বিরোধিতা করেন। অপরদিকে স্বতন্ত্রেরা নিজেরাই পুরোপুরি নির্ধারিত হয় শ্রম বিভাগ দ্বারা; আর তাই একে অপরের ওপর সবচাইতে সম্পূর্ণ নির্ভরতায় আসে। ব্যক্তিসম্পত্তি, এতদূর পর্যন্ত খোদ শ্রমের ভেতরেই তা শ্রমের সঙ্গে বিরোধ হিসেবে, পুঞ্জিভবনের প্রামাণিকতার ভেতর হতে বের হয়ে আসে আর এখনো একে বরং সম্প্রদায়ের আঙ্গিক থেকে শুরু করতে হয়। কিন্তু এর পরবর্তী বিকাশে এটি অধিক থেকে অধিক ব্যক্তি সম্পত্তির আধুনিক উপস্থাপন করতে থাকে। শ্রমের শর্ত, হাতিয়ার এবং মালমশলার বিভাজনের যাত্রা হতে শ্রমবিভাজন নির্দেশিত হয়। আর এভাবে পুঞ্জিভূত পুঁজির বিভিন্ন মালিকের মাঝে টুকরো হওয়া, পুঁজি আর শ্রমের এবং বিভিন্ন আঙ্গিকের খোদ সম্পত্তির বিভাজন হয়। শ্রম বিভাজন যত বিকশিত হয় আর পুঞ্জিভবন বাড়ে, বিভাজনকরণের প্রক্রিয়া যে আঙ্গিক ধারণ করে তা আরো তীক্ষ্ণ হয়। টুকরো করার এই প্রাকসিদ্ধান্তেই কেবল শ্রম বহাল থাকতে পারে।
এমনি করে এখানে দুটো ঘটনা উন্মোচিত হয়। প্রথমে উৎপাদনী শক্তিগুলো আবির্ভূত হয় খোদ তাদের জন্যই এক জগত হিসেবে, স্বতন্ত্রদের থেকে একদম স্বাধীন আর তালাক পাওয়া হিসেবে, স্বতন্ত্রদের পাশাপাশি। এর কারণ হচ্ছে, যে স্বতন্ত্রেরা এই শক্তিগুলোর মালিক তারা একে অপরের থেকে আলগা আর বিরুদ্ধে বহাল থাকে, যখন অন্য দিকে এই শক্তিগুলো এসব স্বতন্ত্রদের মেলামেশা আর সংঘে একমাত্র বাস্তব শক্তি। এভাবে আমরা উৎপাদনী শক্তির একটা সমগ্রতা পাই, তা যেন বস্তুগত আঙ্গিক পায়। আর স্বতন্ত্রদের শুক্িত নয়, বরং ব্যক্তিসম্পত্তির শক্তি হাজির হয়। এভাবে স্বতন্ত্ররা যদ্দুর খোদ নিজেরাই ব্যক্তি সম্পত্তির মালিক ততদূরই তাদের শক্তি। আগের কোনকালেই স্বতন্ত্র হিসেবে স্বতন্ত্রের মেলামেশার প্রতি উৎপাদনী শক্তি এত অভিন্ন আঙ্গিক গ্রহণ করেনি। কারণ তাদের মেলামেশা পূর্বে খোদ নিজেই ছিল একটা নিষিদ্ধ জিনিস। অপরদিকে স্বতন্ত্রদের সংগরিষ্ঠদের আমরা পাই এই উৎপাদনী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অবস্থায়, যে স্বতন্ত্রদের থেকে এই শক্তিগুলো কেড়ে নেয়া হয়েছে আর যারা এভাবে সমস্ত বাস্তব জীবন আধার লুন্ঠিত হয়ে অমূর্ত স্বতন্ত্রে পরিণত হয়েছে, কিন্তু যারা কেবল এই ঘটনা দ্বারাই স্বতন্ত্র হিসেবে একে অপরের সাথে সম্পর্কে প্রবেশ করার অবস্থানে স্থাপিত হয়।
উৎপাদনী শক্তি আর তাদের নিজেদের অস্তিত্বের সাথে এখনো যোগ করে রেখেছে যে একমাত্র সম্পর্ক তা হল শ্রম। এই শ্রম আত্ম-ক্রিয়ার(৩৯) সমস্ত সদৃশ হারালো আর জীবন ধারণ করতে লাগলো জীবনকে বামন বানিয়ে। যেখানে আগের কালগুলোতে আত্ম-ক্রিয়া এবং বস্তুগত জীবনের উৎপাদন আলাদা হয়ে ছিল, তাতে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিতে বিকশিত হত আর তখন স্বতন্ত্রদের নিজেদের সংকীর্ণতার কারণে বস্তুগত জীবনের উৎপাদন বিবেচিত ছিল আত্ম-ক্রিয়ার আনুসঙ্গিক ধরণ হিসেবে। তারা এখন ভাগ হয়ে গেল এমন বিস্তৃতিতে যে শেষ পর্যন্ত বস্তুগত জীবন আবির্ভূত হল লক্ষ্য হিসেবে। আর এই বস্তুগত জীবন উৎপাদন করে যে শ্রম (যা এখন একমাত্র সম্ভাব্য, কিন্তু আমরা দেখি, আত্ম-ক্রিয়ার নেতিবাচক আঙ্গিক), তা আবির্ভূত হল উপায় হিসেবে।
জিনিসগুলো এভাবে এখন এমন এক মোড়ে পৌঁছাল যে স্বতন্ত্রদের অবশ্যই উৎপাদনী শক্তিগুলোর বহাল সমগ্রতাকে আত্মস্থ করতে হবে শুধুমাত্র আত্ম-ক্রিয়া অর্জন করতে নয় বরং একই সাথে নিছক তাদের অস্তিত্বটাই রক্ষার খাতিরে। এই যথার্থকরণ প্রথমে নির্ধারিত হয় যথার্থকরণের বিষয়, উৎপাদনী শক্তিগুলো দিয়ে, যা একটা সমগ্রতায় বিকশিত হয়েছে আর যা কেবল সার্বজনীন মেলামেশাতেই বহাল থাকে। কেবল এই প্রেক্ষাপট থেকেই তাই এই যথার্থকরণের উৎপাদনী ক্ষমতা ও মেলামেশার সাথে সম্পৃক্ত অবশ্যই একটা সার্বিক চরিত্র আছে। এই ক্ষমতার যথার্থকরণ নিজে উৎপাদনের বস্তুগত সরঞ্জামের সাথে সম্পৃক্ত স্বতন্ত্র যোগ্যতার বিকাশ ছাড়া কিছু নয়। উৎপাদনের সরঞ্জামের সমগ্রতার যথার্থকরণ একই কারণে, খোদ স্বতন্ত্রদের নিজেদের মাঝে যোগ্যতার সমগ্রতার বিকাশ।
এই যথার্থকরণ আরো নির্ধারিত হয় যথার্থকারী স্বতন্ত্রদের দিয়ে। কেবলমাত্র আজকের দিনের আত্ম-ক্রিয়ার সকল দ্বার বন্ধ হওয়া প্রলেতারিয়রাই একটি সম্পূর্ণ এবং অর্গলহীন আত্ম-ক্রিয়া অর্জন করার অবস্থানে আছে, যা উৎপাদনী শক্তির একটি সামগ্রিকতা যথার্থকরণ আর এভাবে স্বীকার্য হওয়া ধারণক্ষমতার সমগ্রতার বিকাশে গঠিত। পূর্বের সব বিপ্লবী যথার্থকরণ ছিল সীমিত; স্বতন্ত্রদের আত্ম-ক্রিয়া সীমাবদ্ধ ছিল উৎপাদনের আকাট সরঞ্জামকে পরিমার্জন করে সীমাবদ্ধতার একটা নিছক নতুন দশা অর্জিত হল। তাদের উৎপাদনের সরঞ্জাম তাদের সম্পত্তি হল, কিন্তু তারা নিজেরাই রয়ে গেল শ্রম বিভাগ আর তাদের উৎপাদনের নিজেদের সরঞ্জাম দ্বারা নির্ধারিত। এখন পর্যন্ত সব দখল ছাড়া করানোতে স্বতন্ত্রদের একটা বিশাল সংখ্যা বশ রয়ে গেল উৎপাদনের সরঞ্জামটির। প্রলেতারিয়েতদের দ্বারা যথার্থকরণে উৎপাদন সরঞ্জামের একটি বিশাল পরিমাণ অবশ্যই প্রত্যেক স্বতন্ত্রের বিষয় আর সবার প্রতিসম্পত্তি করতে হবে। আধুনিক সার্বজনীন মেলামেশা স্বতন্ত্রদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, তাই তা হতে পারে কেবল তখনই যখন তা সবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।
এই যথার্থকরণ আরো নির্ধারিত হয় সেই ধরণ দিয়ে যাতে এটি অবশ্যই প্রভাবিত হবে। এটি প্রভাবিত হতে পারে একটি সম্মিলনঞ্চর মাধ্যমে, যা আবার প্রলেতারিয়েতের নিজের চরিত্র দ্বারা কেবল হতে পারে সার্বজনীন এবং তা হতে পারে বিপ্লবের মাধ্যমে যাতে একদিকে পূর্বতন উৎপাদনী ধরণ এবং মেলামেশা ও সমাজ সংগঠনের ক্ষমতা ছুড়ে ফেলা হয়; অপরদিকে সেখানে বিকশিত হয় প্রলেতারিয়েতের সার্বিক চরিত্র ও শক্তি যা ছাড়া বিপ্লব সম্পন্ন করা যায় না; আর যাতে প্রলেতারিয়েত নিজেকে সেই সব জিনিস থেকেও ছাড়িয়ে নেয় যা এখনো আগের সামাজিক অবস্থান থেকে তার সঙ্গে সেঁটে আছে।
কেবলমাত্র এই দশাতেই আত্ম-ক্রিয়া বস্তুগত জীবনের সাথে মিলে ঝুলে যায়, যা স্বতন্ত্রের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রে বিকশিত হওয়া আর সমস্ত স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা ঝেড়ে ফেলার সমার্থক। শ্রমের আত্ম-ক্রিয়ায় রূপান্তর পূর্বের গন্ডি বাধা মেলামেশার স্বতন্ত্রদের এই রকম মেলামেশাতে রূপান্তরের সাথে মিল খায়। ঐক্যবদ্ধ স্বতন্ত্রদের মাধ্যমে পুরো উৎপাদনী শক্তির আত্মসাৎকরণের সাথে ব্যক্তি সম্পত্তি সমাপ্তিতে আসে। যেখানে আগে ইতিহাসে একটা নির্দিষ্ট শর্ত সবসময়ই আকস্মিক হিসেবে আবির্ভূত হত, এখন সেখানে স্বতন্ত্রদের বিচ্ছিন্নতা আর প্রত্যেক মানুষদের বিশেষ ব্যক্তি লাভ নিজেই আকস্মিক হয়ে যায়।
যে স্বতন্ত্রেরা এখন আর শ্রম বিভাগের অধীন নেই, তাদের এই দার্শনিকরা জ্ঞমানুষঞ্চ নাম দিয়ে একটি আদর্শ হিসেবে ধারণা করে। আমাদের রূপরেখা টানা পুরো প্রক্রিয়াটাকে তারা ধারণা করে জ্ঞমানুষেঞ্চর বিবর্তনী প্রক্রিয়া হিসেবে, যাতে প্রতিটি ঐতিহাসিক দশায় মানুষ বদলী হয়ে বসেছিল স্বতন্ত্রের জায়গায় আর প্রদর্শিত হয়েছিল ইতিহাসের চালনা শক্তি হিসেবে। পুরো প্রক্রিয়াটা এভাবে ধারণা করা হয়েছিল জ্ঞমানুষঞ্চ(৪০) এর আত্ম-বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া হিসেবে। এরকম মনে করার কারণ নিশ্চিতভাবেই এই পরের দশার গড়পড়তা স্বতন্ত্রদের তালগোল পাকিয়ে সবসময় জুড়ে দেয়া হয় আগের দশায়, আর পরের কালের চৈতন্য জুড়ে যায় আগের কালের স্বতন্ত্রদের উপর। এই উল্টোপাল্টা কাজটা ছিল বাস্তব অবস্থার একটি বিমূর্ত ছবি। এর মাধ্যমে পুরো ইতিহাসকে চৈতন্যের একটি বিবর্তনী প্রক্রিয়াতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছিল।
আমাদের আঁকা ইতিহাসের ধারণা থেকে চূড়ান্ত বিচারে আমরা এই উপসংহার লাভ করি :
(১) উৎপাদনী শক্তির বিকাশে এমন একটা দশা আসে যাতে উৎপাদনী শক্তি আর মেলামেশার উপায় অস্তিত্বে আসে। এই অস্তিত্ব বহাল সম্পর্কের অধীনে শুধু ঝামেলা বাধায়; তারা আর উৎপাদনী নয় বরং ধ্বংসকারী শক্তি (যন্ত্রপাতি এবং টাকা)। আর এর সাথে সংযুক্ত একটা শ্রেণীও আসে যাদের সমাজের সব বোঝা বইতে হয় এর সুবিধা উপভোগ না করেই। এই শ্রেণী সমাজ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে বাকি সব শ্রেণীর সাথে সবচাইতে নির্ধারিত দ্বন্দ্বে নামতে বাধ্য হয়, এই শ্রেণী সমাজের সবচাইতে বৃহৎ, এর মাঝ হতে একটি মৌলিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার চৈতন্য প্রবাহিত হয়। এই চৈতন্য হল কমিউনিস্ট চৈতন্য যা অবশ্যই অন্যান্য শ্রেণীগুলোর মাঝেও জাগতে পারে এই অবস্থা অনুধ্যান করে।
(২) যে শর্তগুলোর অধীনে নির্দিষ্ট উৎপাদনী শক্তি প্রয়োগ করা যায়- তারা সমাজের নির্দিষ্ট একটা শ্রেণীর শাসনের শর্ত, যাদের সম্পত্তি হতে আসা সমাজ ক্ষমতার ব্যবহারিক-ভাববাদী প্রকাশ ঘটে রাষ্ট্র আঙ্গিকের প্রতিটি ঘটনায়; আর এজন্যে প্রতিটি বিপ্লবী সংগ্রাম তখনো পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা শ্রেণীর বিরুদ্ধে চালিত হয়।
(৩) এখন পর্যন্ত হওয়া সব বিপ্লবে কাজকর্মের ধরণের গায়ে কোন আঁচড় লাগেনি। আর এটা ছিল এই কাজকর্মের ভিন্ন ধরণের বন্টনের প্রশ্ন, অন্য ব্যক্তিদের প্রতি শ্রমের ভিন্ন ধরণের বন্টন, যেখানে কমিউনিস্ট ধরণের বিপ্লব কাজ কর্মের চলমান ধরণের বিরুদ্ধে নির্দেশিত হয়ে শ্রম লোপাট করে দেয় আর খোদ শ্রেণীর সাথে সাথে সব শ্রেণীর শাসন নিশ্চিহ্ন করে দেয়। কারণ এটি নির্বাহ হয় সেই শ্রেণী দ্বারা, যারা সমাজে আর শ্রেণী বলে গণ্য নয়, শ্রেণী বলে পরিচিত নয়। আর এটি নিজে বর্তমান সমাজের ভেতরের সব শ্রেণী, জাতীয়তা প্রভৃতির মিলিয়ে যাবার প্রকাশ; এবং
(৪) এই কমিউনিস্ট চৈতন্য ব্যাপক মাত্রায় উৎপাদন আর খোদ কারণটির সাফল্য- উভয়ের জন্যই ব্যাপক মাত্রায় মানুষের পরিবর্তন আবশ্যকীয়। এই পরিবর্তন কেবল সংগঠিত হতে পারে ব্যবহারিক সঞ্চালনে, একটি বিপ্লবে; এই বিপ্লব প্রামাণিক। এই বিপ্লবটা শুধুমাত্র একারণে প্রয়োজনীয় নয় যে শাসক শ্রেণীকে অন্য কোন ভাবে উৎখাত করা যাবেনা; বরং এজন্যও প্রয়োজনীয় যে, একে ছুঁড়ে ফেলছে যে শ্রেণী তা শুধুমাত্র একটা বিপ্লবের মাধ্যমেই নিজের গা থেকে কালের যত আবর্জনা ঝেড়ে নতুনতর সমাজ তৈরীর উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে।

পরবর্তী অংশ